Posted in ইতিহাস-ঐতিহ্য

হারিয়ে যাচ্ছে প্রাচীন ঐতিহ্যের রাধা চক্করের মেলার আসল রূপ

মানিকগঞ্জ হতে নজরুল ইসলাম: মেলা হলো গ্রাম বাংলার লোকায়ত চর্চার অন্যতম বাহন। এখানে থাকে না কোন জাতিভেদ, বর্ণভেদ-সকল বর্ণের সকল ধর্মের মানুষের এক মহামিলন কেন্দ্র হলো গ্রামীন মেলা। এছাড়্ওা মানুষের চাহিদা পুরণে বিশেষত শিশুদের মন আকৃষ্ট করতে বৈচিত্রপূর্ণ বহুপণ্যের সমারহ ঘটে মেলাতে। গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা হয় সচল। মেলাকে কেন্দ্র করে অনেকে মৌসুমভিত্তিক ফটকা কারবারে লিপ্ত হয়। এতে কেউ কেউ লাভবান হয়, আবার কারো লোকসান গুণতে হয়। তারপরও কিছু অর্থের বিনিময় ঘটে, যা দ্বারা প্রন্তিক পর্যায়ের মানুষেরা সাময়িক হলেও উপকৃত হয়। ফলে গ্রাম পর্যায়ে মেলার গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনেক, যা আমরা এখনো অনুধাবন করতে পারি না। এবং এই মেলার সংস্কৃতি টিকে থাক এটি সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী চায় না। আর স্থানীয় প্রগতিশীল ব্যক্তিদের সহযোগীতার অভাবে দিনে দিনে হারিযে যাচ্ছে প্রাচীন ঐতিহ্যের হাজার বছরের লোকায়ত চর্চা কেন্দ্র গ্রামীন মেলা।

তারই অন্যতম একটি মেলা হলো মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলার নালী ইউনিয়নের উভাজানি গ্রামে রাধা চক্করের মেলা। উভাজানি গ্রামের বৈরাগী হিন্দু সম্প্রদায় পরিবারের লোকেরা হচ্ছে এই মেলার মূল আযোজক এবং সহযোগীতা করছে গ্রামবাসীসহ স্থানীয় লোকজন। উভাজানি গ্রামের আব্দুর রহমান বয়াতী (৭৫) বলেন, এই মেলা আনুমানিক তিনশত বছর পূর্ব হতে এখনো চালু আছে। কথিত আছে, বৈশাখ মাসে আউশ-আমন ধানের বাইন দেয়ার জন্য মাটিতে যেন পোম থাকে, তারজন্য বৃষ্টির খুবই দরকার। তখন বৃষ্টি প্রার্থনার তৎসময়ে হিন্দুরা রাধাগোবিন্দ বিগ্রহ স্থাপন করে পূজা অর্চনা করতেন। তাদের এই রাধা-গোবিন্দ বিগ্রহটি স্বর্ণের নির্মিত ছিল।

বর্তমান পিতলের বিগ্রহ রয়েছে, মাধবি রানী সরকার (৮৬) বলেন, এই পিতলের বিগ্রহটি মহিলাদের গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত কুলার মাঝখানে স্থাপন করে গ্রামের প্রত্যেক ঘরে ঘরে ঘুরে তারা টাকা-পয়সা, চাল, ডাল ইত্যাদি সংগ্রহ করে এবং তা দিয়ে পরে পুজা ও ভোগের আয়োজন করা হয়। এই পূজা ও ভোগ উপলক্ষ্যে হরি উৎসবও হয়ে থাকে। এই হরি উৎসব ও পূজাকে কেন্দ্র করেই মূলত এই রাধা চক্করের মেলার উদ্ভব হয়েছে। উভাজানির এই মেলা প্রতি বছর বৈশাখ মাসের প্রথম বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এই মেলার বিশেষ আকর্ষণ হলো ছেলেমেয়েদের চিত্তবিনোদনের জন্য নাগরদোলা। এই নাগরদোলাকে অনেকে রাধাচক্কর বলে অভিহিত করে। রাধা চক্করের আধিক্য হেতু অবশেষে এই মেলা সবার কাছে রাধাচক্করের মেলা হিসেবে স্থানীয় ও জাতীয়ভাবে পরিচিতি লাভ করে।

আজ হতে বিশ বছর আগেও এই মেলায় হিন্দুদের অংশগ্রহণ ছিল প্রচুর এবং মুসলমানদের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখ করার মত। এই মেলায় অসংখ্য সাধুসন্যাসীদের আগমন ঘটত বলে এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিদের মাধ্যমে জানা যায়। এই মেলা অত্যন্ত জাকজমকপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হত।

বর্তমানে এই মেলায় আগের মত জনসমাগম হয় না। তেমন সাধু-সন্যাসীদের আগমনও প্রত্যক্ষ করা যায় না। রাধারামন মাঝি (৭৭) বলেন, মেলার সেই অতীত ঐতিহ্য আর নেই। এখন কোন মতে বেঁচে আছে আমাদের মত কযেকজন অতি উতসাহী রাধা-গোবীন্দ্র ভক্তদের প্রত্যেক্ষ মেহানতের কারণে। মেলার প্রধান আকর্ষণ নাগর দোলা ও সার্কাস হলেও প্রচুর বেচাকেনা হতে স্থানীয় ভাবে গড়ে ওঠা হরেক রকমের মিষ্টান্ন-আমের্তি, জিলাপি, চমচম, রসগোল্লা, রাজভোগ, কালোজাম, দই, ঘি, দানাদার, সন্দেশ ইত্যাদি। এছ্ড়াাও বেদেরা আসত মহিলাদের ও শিশুদের হরেক রকমের বাহারি আকর্ষণের বানিয়াদি, প্রসাধনি, বিলাসি রঙের পোশাক-পন্য ইত্যাদি নিয়ে। তাছাড়া তুলা, তামা, কাসা, মাটির তৈরি বিভিন্ন রকমের তৈজসপত্র বিশেষ করে শিশুদের খেলনার জন্য মাটির তৈরি দুলদুল, ঘোড়া, টমটম ইত্যদি শিশুদেরকে এখনো আকৃষ্ট করে। গ্রামীন কারু শিল্পীদের তৈরি অসংখ্য উপকরণ, হরেক রকমের খাদ্য সম্ভার, চিনির সাজ, কদম, সাজ, বাতাসা, বিন্নি খই, মুড়ি, ভ্রাম্যমান দোকনীদের নানা রকমের পণ্যসামগ্রী এখনো পাওয়া। তবে সেটি আগের তুলনায় অনেক কম।

কারু শিল্পী মেলার দোকানদার হারুন আর রশিদ (৬৮) বলেন, আমি ১৭ বছর ধরে একভাবে এই মেলায় দোকান করছি। বছর যাচ্ছে আর মেলার আসল রূপ পাল্টে যাচ্ছে। আগে আমাদের এই পণ্যগুলো প্রচুর বেচাকেনা হতো। মেলায় গ্রামের নারীরা আসত কেনাকাটা করত, সংসারের জিনিস কিনত, ছেলেমেয়েদরকে যা কিনে দিতে তাই নিত, মেলায় একটি প্রাণ ছিল। এখন মেলা নষ্ট হয়ে গেছে। কারণ বেচাকেনার জন্য আগের সেই জিনিস তৈরীর কারিগর নেই, পেশা পরিবর্তন হচ্ছে, ফলে মেলার মধ্যে দেশী পন্যেও চেয়ে বিদেশী পন্যে সমারহ বেশি। যেমন- এখন প্লাস্টিকের বিভিন্ন জিনিস হরেক মাল বলে চালিযে দিচ্ছে, খাদ্যেও মধ্যে বিভিন্ন কোমল পানীয়, কৃত্রিম খারার বেচাকেনা হচ্ছে। উঠতি যুবকরা নেশাগ্রস্থ হচ্ছে নেশার জিনিসও বিক্রি হয়। মেলায় মুরুব্বিদের আগমন আগের তুলনায় অনেক কম। মেলার লোক সংখ্যা কমে নাই মেলার ঐতিহ্য কমেছে, প্রাণ কমেছে।

এই মেলাকে আবার জীবন্ত করতে হলে পুরাতন মানুষদেরকে আবার হাল ধরতে হবে, নতুনদেরকে তাদের মাধ্যমে শিখতে হবে এবং সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে মেলার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাবে। জেলার অন্যতম প্রাচীন-ঐতিহ্যের এই রাধাচক্করের মেলা প্রতি বছর আজো নির্দিষ্ট সময়ে বসে কিন্তু আগের মত সেই বৈচিত্র আর নেই।

লেখক:

online news portal

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s